'অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র' মামলায় ১৬ জনের জামিন নাকচ

Bangla Post Desk
বাংলা পোস্ট প্রতিবেদক
প্রকাশিত:২৯ আগস্ট ২০২৫, ০২:২২ পিএম
'অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র' মামলায় ১৬ জনের জামিন নাকচ

রাজধানীর শাহবাগ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় সাবেক বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনসহ মোট ১৬ জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। 

শুক্রবার (২৯ আগস্ট) সকালে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এবং শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তৌফিক হাসান তাদের আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।

এসময় আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখিসহ অন্যরা জামিন আবেদন করেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর শামসুদ্দোহা সুমন এর বিরোধিতা করেন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলায় যাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে তারা হলেন: সাবেক বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী (৭৫), মোঃ আব্দুল্লাহ আল আমিন (৭৩), শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন (৫৫), মঞ্জুরুল আলম (৪৯), কাজী এটিএম আনিসুর রহমান বুলবুল (৭২), গোলাম মোস্তফা (৮১), মোঃ মহিউল ইসলাম ওরফে বাবু (৬৪), মোঃ জাকির হোসেন (৭৪), মোঃ তৌছিফুল বারী খাঁন (৭২), মোঃ আমির হোসেন সুমন (৩৭), মোঃ আল আমিন (৪০), মোঃ নাজমুল আহসান (৩৫), সৈয়দ শাহেদ হাসান (৩৬), মোঃ শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার (৬৪), দেওয়ান মোহম্মদ আলী (৫০) এবং মোঃ আব্দুল্লাহীল কাইয়ুম (৬১)।

এদিন সকাল ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে পুলিশ তাদের আদালতে হাজির করে। এরপর তাদের সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাদের এজলাসে তোলা হয়। এসময় তাদের হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট এবং বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো ছিল। তাদের আসামির কাঠগড়ায় রাখা হয়।

আসামিদের মধ্যে শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন) পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্য করে বলেন, 'ভয়াবহ অবস্থা। বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট খুলি।' এরপর পুলিশ সদস্যরা তাদের জ্যাকেট খুলে দেন।

কাঠগড়ায় সবার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। এসময় তাকে হাস্যোজ্জ্বল দেখা যায়। তিনি পানি পান করেন এবং মাঝে মধ্যে মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক এজলাসে ওঠেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে আইনজীবীরা আসামিদের স্বাক্ষর নিতে চান। লতিফ সিদ্দিকী বাদে অপর অধিকাংশ আসামিই ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেন। লতিফ সিদ্দিকীর কাছে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম সাইফ স্বাক্ষর নিতে গেলে তিনি ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেননি।

আইনজীবী সাইফুল ইসলাম সাইফ জানান, তিনি যখন জামিনের আবেদনের জন্য লতিফ সিদ্দিকীর কাছে ওকালতনামায় স্বাক্ষর করতে যান, তখন লতিফ সিদ্দিকী বলেন, 'যে আদালতের জামিন দেওয়ার ক্ষমতা নেই, তার কাছে কেন জামিন চাইবো? আমি ওকালতনামায় স্বাক্ষর করবো না, জামিন চাইবো না।' 

আইনজীবী আরও জানান, লতিফ সিদ্দিকী যতবারই স্বাক্ষর করতে যান, ততবারই তিনি একই কথা বলেন, এই কারণে তিনি জামিনের প্রার্থনা করেননি। লতিফ সিদ্দিকী আদালতের প্রতি আস্থাহীনতার কথা জানিয়েছেন বলে আইনজীবী উল্লেখ করেন।

মামলার বিবরণে যা বলা হয়েছে

সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ এর ৬(২)/৪(১)/৬(২)/১২ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।

মামলার বিবরণে বলা হয়, গত ২৮ আগস্ট সকাল ১১টায় মামলার বাদী (পুলিশ পরিদর্শক) দেখতে পান যে, রিপোর্টার্স ইউনিটির অডিটোরিয়ামে কিছু লোক ঘেরাও করে 'আওয়ামী ফ্যাসিস্ট' বলে স্লোগান দিচ্ছে এবং সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী বক্তব্য দিচ্ছেন। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট 'মঞ্চ ৭১' নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, যার উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র ও বিকৃতি বন্ধ করা এবং জনগণের সঙ্গে নিয়ে আত্মত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়া। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২৮ আগস্ট সকাল ১০টায় একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিসহ আরও ৭০-৮০ জন অংশগ্রহণ করে। পরে পুলিশ আসামিদের হেফাজতে নেয়।

উপস্থিত লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী (৭৫) 'মঞ্চ ৭১'-এর ব্যানারকে পুঁজি করে প্রকৃতপক্ষে দেশকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অস্থিতিশীল করতে এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র ও উপস্থিত অন্যদের প্ররোচিত করে বক্তব্য প্রদান করছিলেন। তার এই ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্যের জন্য উপস্থিত লোকজন তাদেরকে ঘেরাও করে 'আওয়ামী ফ্যাসিস্ট' বলে স্লোগান দিচ্ছিল। আসামিরা পরস্পর সহায়তাকারী হিসেবে দেশকে অস্থিতিশীল করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার অপরাধ করেছেন।

মামলাটি তদন্তাধীন। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং আসামিদের নাম-ঠিকানা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত তাদের জেল হাজতে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করে পুলিশ। 

যা ঘটেছিল

বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট)  ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে 'আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান' শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে 'মঞ্চ ৭১' প্ল্যাটফর্ম। তবে সকাল ১১টার কিছু পর ওই আলোচনা সভা 'জুলাই যোদ্ধাদের' প্রতিরোধের মুখে পণ্ড হয়ে যায়। 

এ প্ল্যাটফর্মের সমন্বয় করছেন গণফোরামের নেতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (বীর প্রতীক) ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। বৃহস্পতিবারের ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল গণফোরামের সাবেক সভাপতি কামাল হোসেনের। তবে তিনি সেখানে ছিলেন না। 

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আলোচনা সভায় বক্তারা 'জয় বাংলা' স্লোগান দেন এবং জুলাই আন্দোলনের 'সমালোচনা করে বক্তব্য' দেন।

আলোচনা সভার এক পর্যায়ে সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনসহ বর্তমানে আটক ১৬ জনকে 'জুলাই যোদ্ধা' ব্যানারে একদল জনতা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে পুলিশ তাদের পুলিশে সোপর্দ করা হয়।