এশিয়ার ৩ দেশে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে প্রাণহানি ৪৬০
মালাক্কা প্রণালীতে সৃষ্টি হওয়া বিরল এক ট্রপিক্যাল ঝড় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিন দেশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চল ডুবিয়ে দিয়েছে। ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে এই তিন দেশে প্রাণহানির সংখ্যা ৪৬০-এর বেশি বলে খবর পাওয়া গেছে।
শনিবার দেশ তিনটিতে উদ্ধার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ খবর নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি সপ্তাহে প্রবল মৌসুমি বর্ষণে এই তিনটি দেশে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস দেখা দেয়। এতে শত শত মানুষ নিহত হয় এবং হাজারো মানুষ আটকা পড়ে। বহু মানুষ ছাদে আশ্রয় নিয়ে উদ্ধারের অপেক্ষায় ছিলেন।
ইন্দোনেশিয়ায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ
ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সেখানে অন্তত ৩০৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ২৭৯ জন এখনো নিখোঁজ।
উত্তর সুমাত্রায় শনিবার আরও ৩১টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রাদেশিক পুলিশের মুখপাত্র জানিয়েছেন।
পশ্চিম সুমাত্রায় ৬১ জন নিহত এবং ৯০ জন নিখোঁজ বলে শুক্রবার গভীর রাতে আঞ্চলিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে।
এছাড়া আচেহ প্রদেশে মৃতের সংখ্যা অন্তত ৩৫ জন। এ প্রদেশজুড়ে ২৮,৪০০–এরও বেশি মানুষকে সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যেতে এবং নিখোঁজ মানুষদের খুঁজতে ৩,৫০০–র বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

৮০,০০০ মানুষ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে
এদিকে সুমাত্রার তিনটি প্রদেশে ৮০,০০০ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, এবং অনেকেই এখনো আটকে আছেন।
জাতীয় দুর্যোগ সংস্থার প্রধান সুহারিয়ান্তো জানান, শনিবারের মধ্যে বর্ষণ কমে এলেও পশ্চিম সুমাত্রায় কৃত্রিম বৃষ্টিবিনাশ (cloud seeding) চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
থাইল্যান্ডে ৩৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত
থাইল্যান্ডের দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন বিভাগ শনিবার জানায়, দেশে ১৪ লাখ পরিবার, অর্থাৎ ৩৮ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সংখলা প্রদেশে পানির উচ্চতা ৩ মিটার পর্যন্ত পৌঁছায় এবং অন্তত ১৪৫ জন নিহত হয়েছে—গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা।
থাইল্যান্ডজুড়ে ৮টি প্রদেশে মৃত্যুসংখ্যা বেড়ে ১৬২–তে দাঁড়িয়েছে।
হাট ইয়াই এলাকার একটি হাসপাতালের মর্গ পূর্ণ হয়ে গেলে মৃতদেহগুলো রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে রাখা হয়।
এদিকে শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, সরকারে থাকা অবস্থায় এমন ঘটনা ঘটতে দেওয়ার জন্য সত্যিই আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
তিনি বলেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকানোই এখন মূল লক্ষ্য এবং ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে দুই সপ্তাহ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছে—পরিবারে কেউ মৃত হলে সর্বোচ্চ ২০ লাখ বাহাত (৬২,০০০ ডলার) দেওয়া হবে।
এদিকে রাচানে রেমস্রিঙ্গাম নামের স্থানীয় এক দোকানি জানান—বন্যার পর তার দোকান লুটপাট ও ভাঙচুর করা হয়েছে এবং তিনি কয়েক লাখ ডলারের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ক্রমবর্ধমান জনসমালোচনার মধ্যে দু’জন স্থানীয় কর্মকর্তাকে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে।
বিরোধীদল পিপলস পার্টির এক এমপি দাবি করেন—সরকার পরিস্থিতি ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছে এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় বড় ভুল করেছে।
৪৪ বছর বয়সি বন্যাদুর্গত অ্যামফর্ন কায়োফেংক্রো রয়টার্সকে জানান—তিনি ও তার পরিবারের সাত সদস্য ৪৮ ঘণ্টা দ্বিতীয় তলার একটি টেবিল, জানালার ফ্রেম এবং ওয়াশিং মেশিনের ওপর বসে কাটিয়েছেন, যখন হাট ইয়াই শহরে একদিনে ৩৩৫ মিমি বৃষ্টি হয়েছিল—যা ৩০০ বছরের রেকর্ড।
মালয়েশিয়ায় দুজনের মৃত্যু
এদিকে মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় পারলিস প্রদেশে অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বরের বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলে ভারি বৃষ্টি হয়, যার ফলে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়।
এবারে একটি ট্রপিক্যাল ঝড় পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে এবং ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে প্রাণহানির সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মৌসুমি বৃষ্টির স্থিতিকাল ও তীব্রতা বদলে গেছে— ফলে বৃষ্টিপাত বেড়েছে, আকস্মিক বন্যা তীব্র হচ্ছে, আর বাতাসের ঝাপটা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
